বসতঘরে পানি উঠার আতঙ্কে কুমিল্লাবাসী

225
ফেসবুকে ফলো করুন

সাজেদুর রহমান : ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কথা এখনো ভুলেনি চৌদ্দগ্রামবাসী। গত বছরের সেই বন্যার দুঃস্মৃতি যেন এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের। সেই ক্ষত না মুছতেই কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গত চারদিনের টানা ভারী বর্ষণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি উপজেলার বেশকিছু স্থানে মানুষের বসতবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে।

বৃষ্টিপাত আর কয়েকদিন থাকলে অধিকাংশ বাড়িঘর ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় দিনাতিপাত করছে চৌদ্দগ্রামবাসী। গত বছরের বন্যার মত ক্ষতির শঙ্কায় আছে তারা।

বৃহস্পতিবার উপজেলার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা, আলকরা, গুনবতী, জগন্নাথদীঘি, চিওড়া, বাতিসা ও কালিকাপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন সীমান্তবর্তী প্রায় এলাকা বৃষ্টির পানি ও ভারত থেকে নেমে আসা উজানের পানিতে প্লাবিত। অন্যান্য এলাকার নিচু বসত ভিটাগুলোতেও পানি উঠেছে। অনেক এলাকায় কৃষি জমিনগুলো ডুবে যাওয়ায় আমন বীজতলা ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছে এলাকার মৎস্য চাষি ও পোল্ট্রি খামারিরা। প্রায় এলাকার গ্রামীণ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর উপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

টানা বৃষ্টিতে চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার বালুজুরি খালের গত বছরের বন্যার ফলে ভাঙা অংশ দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আশেপাশের এলাকার ফসলি জমিন পানিতে টইটুম্বুর হয়ে নিমজ্জিত হয়েছে আমন বীজতলা।

পৌরসভার গোমারবাড়ী গ্রামের জামাল হোসেন বলেন, যেভাবে ভারতের দিক থেকে আসা পানি প্রবাহিত হচ্ছে, তাতে ভয়ে আছি। গত বছরের মতো হঠাৎ করে কখন পানি উঠে যায় বসতঘরে।

একই চিত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্বপাশের প্রায় সব ইউনিয়নের। এরমধ্যে ফেনীর কাছাকাছি দক্ষিণ আলকরার এলাকাগুলোতেও পানি বেড়েছে।

বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে, মাছের ঘের রক্ষা করতে স্থানীয় মাছচাষিরা ব্যস্তসময় পার করছেন। জলাশয়ের চারপাশে নেটের বেড়া দিয়েছেন তারা। অনেক স্থানে পানির স্বাভাবিক স্রোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় নিচু এলাকায় তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। ইতোমধ্যে কিছু কিছু এলাকার জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে লোকালয়ে। রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে জমে গেছে পানি। ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রমসহ প্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধ-বার্ষিক মূল্যায়ন পরীক্ষা।

বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসব এলাকার সাধারণ কৃষক। আমন বীজতলার ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি আমন রোপণেও ঝুঁকি বেড়েছে অনেকটা। তিন-চারদিন ধরে বীজতলা ডুবে থাকায় অনেক স্থানে ধানের চারা পচে গিয়েছে। যেগুলো পচেনি সেগুলোও পচার উপক্রম হয়েছে। পানি না সরলে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণও বাড়বে।

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের বন্যায় উপজেলার অনেক কৃষক আমন রোপণ করতে পারেনি। এই মৌসুমে আমন রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ১৯০ হেক্টর। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫০০ জন কৃষককে প্রণোদনার আওতায় প্রত্যেককে পাঁচ কেজি করে বীজ ধান, বিশ কেজি করে সার প্রদান করা হয়। তবে টানা ভারী বৃষ্টিতে নিমজ্জিত হয়েছে উপজেলার অনেক কৃষকের আমন বীজতলা।

উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান মোল্লা জানান, ‘জলাবদ্ধতায় আমার তিনটি আলাদা আমন বীজতলা এখন পানিতে। এলাকার দু’টি ব্রিকস ফিল্ডের কারণে এখানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং শত শত কৃষকের আমন বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষি অফিসার ডুবে যাওয়া বীজতলা পরিদর্শন করেছেন। দুই-তিন দিনের মধ্যে পানি নেমে না গেলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা চাই উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে প্রশাসন এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।’

উপ-সহকারী কৃষি অফিসার মো. আল-আমিন বলেন, কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় বিভিন্ন স্থানে আমনের বীজতলা ডুবে গেছে। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সংবাদ পেয়ে মুন্সীরহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামে ছুটে এসেছি। এখানে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আটকে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। বিষয়টি উপজেলা কৃষি অফিসারকে অবহিত করেছি। স্থানীয় কৃষকরা লিখিত অভিযোগ দিলে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

এদিকে উপজেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মাঠে সরব রয়েছেন উপজেলা ও পৌর প্রশাসন। সরানো হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন খালের মুখের মানবসৃষ্ট পানির প্রতিবন্ধকতা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘বন্যার আশঙ্কায় পানি প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে গত মাসেই তিনটি খাল খনন ও পরিষ্কার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবীরা সার্বক্ষণিক নিরলসভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছি।’