রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি : শীতলক্ষা নদের ভাসমান জাহাজ থেকে চোরাই তেল খালাস করে কোটপতি বনে গেছেন দুই ্ভাই। ভোজ্য চোরাই সয়াবিন তেলের ব্যবসা করে এক যুগের ব্যবধানে আলিশান বাড়ি, গাড়ির মালিক হয়েছেন তারা। তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে গোলাম দস্তগীর গাজীর ব্যক্তিগত সহকারীর ছত্রছায়ায় দেদার এ ব্যবসা করে। গত ৫ আগষ্ট সরকার পরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে আবারো দেদার চোরাই তেলের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী এলাকার আব্দুল আজিজের দুই ছেলে ফেরদৌস ও আলমগীরের কথা।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও আশপাশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার রূপসী এলাকায় শীতলক্ষ্যর তীর ঘেষে গড়ে উঠেছে সিটি গ্রুপ। যেখানে তেল উৎপাদন করা হয়। সিটি গ্রুপ থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সড়ক পথে ও পানিপথে ভোজ্য সয়াবিন তেল পাইকার কিনে নিয়ে যায়। একযুগ আগেও ফেরদৌস ও আলমগীর পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাতো। সংসার চালাতে ফেরদৌস ও আলমগীর দুই ভাই উপজেলার শীতলক্ষ্যার তীরে রূপসী বাজারে একটি মুদিমনোহরি দোকান দেন। তখন সিটি গ্রুপ থেকে নৌপথে মাঝিরা ট্রলার দিয়ে সয়াবিন তেল, চিনি, আটা ময়দা আনা নেওয়া শুরু হয়। তখন মাঝিরা ১৮৫ কেজির ওজনের তেলের ড্রাম থেকে ৫-১০ কেজি তেল বের করে বাইরে বিভিন্ন খুচরা দোকানে বিক্রি করে ফেলতো। ধীরে ধীরে সয়াবিনের চোরাই তেলের ব্যবসা একাই নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন ফেরদৌস ও আলমগীর। চোরাই তেলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে আওয়ামীলীগের সাবেক মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীর এপিএস ফিরোজ ভুইয়া ওরফে বাবু ফিরোজের শেল্টারে আওয়ালীমীগের অঙ্গসংগঠন সেচ্ছাসেবকলীগে যোগ দেন। সেচ্ছাসেবক লীগে যোগ দিয়েই বেপরোয়া হয়ে পড়ে দুই ভাই। প্রতিদিন ট্রলারে ৫০ থেকে ৬০ টি ড্রাম রাখা যায়। প্রতিটি ট্রলার প্রতিটি ড্রাম থেকেই মাঝিরা ছোট গ্যানালে করে তেল সংগ্রহ করে। সেই তেল নামমাত্র মূল্যে কিনে নেয় ফেরদৌস ও আলমগীর। বাজারে সয়াবিনের তেল ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেই তেল দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট মূল্যেই বিক্রি করেন তারা। প্রতিদিন তারা প্রায় ১০-১৫ ড্রাম চোরাই তেল ক্রয় করে মাঝিদের কাছ থেকে। তাদের কাছে চোরাই তেল বিক্রি করে জহির মাঝি, আলমগীর মাঝি, আলী মাঝি, দুলাল মাঝি, নবী মাঝিসহ প্রায় ৫০ জন মাঝি। চোরাইতেলের টাকার ভাগ যেতো সাবেক এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর এপিএস ফিরোজ ভুইয়া, তারাব পৌর সেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি রাসেল ও উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানজির আহমেদ রিয়াজ। মন্ত্রীর এপিএসের শেল্টারে পুলিশ ও প্রশাসন ছিল তাদের পকেটে। মন্ত্রীর এপিএসের শেল্টারে ফেরদৌস ও আলমগীর রূপসী গন্ডি পেরিয়ে মেঘনাতেও চোরাই তেলের কারবার চালাতে থাকে। মেঘনাতে এ চোরাই তেলের কারবার করতে তারা তাদের নিজস্ব ট্রলার ব্যবহার করতো। আর এ চোরাই তেলের ব্যবসা করে রূপসী স্লুইচগেট এলাকায় প্রায় ১০ কাঠা জমিতে ৪ ইউনিটের একটি ৫ তলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়িটির ভেতরে লাগানো হয়েছে দামি টাইলস, বিদেশী ফার্নিচার, এয়ার কন্ডিশনসহ নানা বিলাসবহুল সব আসবাবপত্র। রূপসী কাহিনা এলাকা রয়েছে ১৫ শতাংশ জমিতে রয়েছে দুইতলা একটি বাড়ি। বাড়িটি ফকরুল নামে এক নামে জুয়াড়ির কাছ থেকে জুয়ার খেলার জেরে কিনে নেন। এছাড়া রূপসী রূপসী, নৌয়াগাঁও ও দেবৈই মৌজায় রয়েছে তাদের প্রায় ৫ বিঘা জমি। রয়েছে দুইটি পিকআপ যার একটির নাম্বার ঢাকা মেট্রো ন ২১৫৮৪৪। এছাড়া একটি ড্রাম ট্রাক রয়েছে। যেগুলো দিয়ে বিভিন্ন স্থানে চোরাই তেল সরবারহ করা হয়। চোরাইতেলের ব্যবসাকে আড়াল করতে চোরাইতেল বিক্রির টাকা দিয়েই শুরু করেন আটা, ময়দা, তেল, চিনির পাইকারি ব্যবসা। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে দেশের সীমান্ত অঞ্চল থেকে ভারতীয় চিনি চোরাই পথে বস্তা পাল্টে নিজের শোরুমে রাখেন ফেরদৌস ও আলমগীর। তাদের দুই ভাইয়ের ব্যাংকে রয়েছে কয়েক কোটি টাকা।
অনুসন্ধ্যানে আরো জানা গেছে, গত ৫ ই আগস্ট আওয়ামীলীগ সরকার পতন হলেও থেমে নেই তাদের চোরাই তেলের ব্যবসা। স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাকে ম্যানেজ করে বীরদর্পে তারা চোরাই তেলের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সামনে ঈদউল ফিতর উপলক্ষ্যে সয়াবিন তেলের চাহিদা দেশজুড়ে থাকবে। প্রকাশ্যেই ট্রলারের ড্রাম থেকে তেল কমমূল্যে কিনে নিচ্ছেন তারা। স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা তাদের চোরাই তেলের কর্মকান্ড চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাহিনা এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, কাহিনী এলাকর ফকরুলের ছিল জুয়ার নেশা। ফেরদৌস ও আলমগীর মিলে ফকরুলকে জুয়া খেলার জন্য অল্প অল্প করে টাকা দিতে থাকে। সেই টাকা যখন কয়েকবছরে অনেক হয়ে যায় তখন জোর করে আওয়ামীলীগের ক্ষমতা খাটিয়ে ফকরুলের কাছ থেকে বাড়ি ও জমি লিখে নেন ফেরদৌস ও আলমগীর।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় তারা বেপরোয়া হয়ে পড়ে। তখন প্রকাশ্যে রূপসী বাজারে চোরাই তেলের ব্যবসা করতো। তাদের ভয়ে প্রশাসন ও স্থানীয় কেউই প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। তাদের বাবা আব্দুল আজিজ স্বাধীনতা যুদ্ধের চুরি করা রিলিফের চাল কিনে বেশি দামে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করতো। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতাচুত্য হলে তারা বিএনপির আশ্রয়ে চলে যায়। বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতাকে মোটা অংকের মাসোয়ারা দিয়েই তারা তাদের চোরাই তেলের ব্যবসা চালাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মাঝি বলেন, কয়েকজন অসাধু মাঝি ট্রলার ড্রাম থেকে সয়াবিন তেল বের করে ফেরদৌস ও আলমগীরের কাছে নামমাত্র দামে বিক্রি করে দেয়। তারা সেই সয়াবিন নির্দিষ্ট দামেই খুচরা ও পাইকারি বাজারে বিক্রি করে দেয়। রূপসী নিউ মডেল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সামনে ভাই বোন স্টোর, ভাগিনা স্টোরসহ কয়েকটি দোকানের আলমগীর ও ফেরদৌসের কাছ থেকে চোরাই তেল কিনে নিয়ে বিক্রি করেন।
এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে গেলে ফেরদৌস বলেন, ফিরোজ ভাই যখন ছিল তখন ট্রলারের ড্রাম থেকে তেল নামানো হতো। এখন তেমন আর তেমন তেল নামানো হয় না। বর্তমানে ১-২ কেজি নামানো যায়।
এ ব্যাপারে আরেক ভাই আলমগীর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আমাদের কোন অবৈধ ব্যবসা নেই। আমরা বৈধভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করছি। জুয়া খেলে বাড়ি কেনার কথা বলা হলে আলমগীর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আমি জুয়া খেলিনা। এ ব্যাপারে আমি কিছু জানি না।
এ ব্যাপারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারি কমিশনার ভূমি তরিকুল আলম বলেন, বর্তমানে বাজারে সয়াবিত তেলের সংকট রয়েছে। যেহেতু অভিযোগ পেয়েছি। কেউ যদি তেল মজুদ বা চোরাই তেল বেচাকেনা করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে|



