মোঃ সাজেদুর রহমান:
আবু রায়হান চার মাস বয়সী শিশু ক্ষুধায় কাঁদছিল। মা হাফিজা তার জন্য দুধ তৈরি করতে চুলায় আগুন দেন খাতুন। সাথে সাথে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। আগুন ধরে যায় পুরো ঘরে। গুরুতর দগ্ধ ছোট্ট আবু রায়হান হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যায়। মা হাফিজা ও বাবা রিপন মিয়া রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। গতকাল রোববার ভোরে গাজীপুর মহানগরের পুবাইল কামারগাঁও পূর্বপাড়ায় ঘটে এ দুর্ঘটনা।
আবু রায়হানকে নিয়ে গাজীপুরে গত তিন বছরে গ্যাসের লিকেজ থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ২৬-এ দাঁড়িয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। জানতে চাইলে এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সঠিক পরিসংখ্যান দিতে পারেননি গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা। বাবা ৭০, মা ৬০ শতাংশ দগ্ধ ।শুক্রবারই কামারগাঁও পূর্বপাড়া সরকারবাড়ি মসজিদের পাশে সাজ্জাদ হোসেনের তিনতলা ভবনের নিচতলায় ওঠেন রিপন মিয়া (২৩) ও হাফিজা খাতুন (২০) দম্পতি। রিপন ময়মনসিংহের তারাকান্দার ঘোষপাড়া গ্রামের লিটন মিয়ার ছেলে। তিনি একটি কোম্পানির মার্কেটিং অফিসার।

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, শুরুতেই দগ্ধ হন হাফিজা। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে শিশুসন্তানসহ দগ্ধ হন রিপন। টের পেয়ে আশপাশের লোকজন এসে তিনজনকে টঙ্গীর আহ্সান উল্লাহ্ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে রেফার করেন চিকিৎসক। সেখানে আবু রায়হানকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পথেই শিশুটির মৃত্যু হয়।
আবু রায়হানের মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করে পুবাইল থানার ওসি এসএম আমিরুল ইসলাম বলেন, রিপনের শরীরের ৭০ শতাংশ ও স্ত্রী হাফিজার শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে।
ওসি জানিয়েছেন, নতুন বাসায় ওঠার পর আসবাব গোছানোর সময় রিপন-হাফিজা দম্পতি রান্নাঘরে গ্যাসের সিলিন্ডার রেখেছিল। সেটির মাথায় থাকা রেগুলেটর লুজ ছিল। যে কারণে শনিবার রাতভর গ্যাস বের হয়ে রান্নাঘরে জমে। ভোরে চুলায় গ্যাস ছেড়ে আগুন ধরাতে গেলেই দুর্ঘটনা ঘটে। আগুন নেভানোর পরও সিলিন্ডার থেকে গ্যাস বের হচ্ছিল। পরে তা বন্ধ করা হয়।
গত দুই বছরে যত হতাহত
চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল রাতে মোগরখাল এলাকায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রাণ যায় দেড় বছর বয়সী আয়ানের। একই ঘটনায় তার মা পারভীন আক্তার, প্রতিবেশী তাসলিমা আক্তার, তাসলিমার মেয়ে তানজিলা আক্তার ও সুমী আক্তার মারা যান। গত বছর ১৩ মার্চ কালিয়াকৈরের তেলিরচালা এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজের কারণে বিস্ফোরণে দগ্ধ হন ৩২ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জন মারা যান।
এর আগে মহানগরের বোর্ডবাজার এলাকায় ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট গ্যাস বিস্ফোরণে মারা যান ফরমান আলী। এ দুর্ঘটনায় আহত তাঁর ছেলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার মিনারুল ইসলাম মারা যান ১৭ আগস্ট। একই বছরের ১১ জানুয়ারি গাজীপুরের মারিয়ালি কলাবাগানে ছেলের বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় কদরজান বেগম (৬৫) নামে এক নারীর।
সতর্ক থাকার পরামর্শ
গাজীপুর জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই ঘটছে এমন দুর্ঘটনা। এতে কেউ কেউ প্রাণ হারান, কেউ দগ্ধ অবস্থায় দুর্বিষহ জীবন বয়ে বেড়ান। তবে গাজীপুরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কয়টি ঘটনা ঘটেছে বা এসব ঘটনায় কতজনের প্রাণহানি ঘটেছে, এমন তথ্য নেই স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কাছে। গাজীপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুন গতকাল রোববার সমকালের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেন। এই কর্মকর্তার ভাষ্য, অনেক সময় তাদের কাছে দুর্ঘটনার বিষয় জানানোও হয় না। তবে গত প্রায় এক বছরে গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ডের ৬৫টি ঘটনার তথ্য আছে। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়নি। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে রক্ষা পেতে কিছু পরামর্শ দেন মোহাম্মদ মামুন। তিনি বলেন, প্রত্যেকের সতর্ক থাকতে হবে। অনুমোদিত ও মানসম্মত সিলিন্ডার, সংযোগ পাইপ ভাল্ব ও রেগুলেটর ব্যবহার করতে হবে। এ ছাড়া চুলা থেকে অন্তত ৩ ফুট দূরে ঠান্ডা ও বাতাস চলাচলের জায়গায় সিলিন্ডার রাখতে হবে। সবচেয়ে ভালো হলো ঘর বা ভবনের বাইরে লোহার বেষ্টনী দিয়ে সিলিন্ডার রাখা। তাঁর পরামর্শ, সিলিন্ডারে লিকেজ আছে কিনা, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাবানের ফেনা ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া নিয়ম মেনে চললে বিস্ফোরণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।



